”আমাদের ব্যক্তিস্বাধীনতার বিরুদ্ধে এক মারাত্মক পদক্ষেপ হতে চলেছে পেগাসাস’ বিস্ফোরক বিভাষ চ্যাটার্জী

|| তিয়াষা বসু ||

পেগাসাস নিয়ে সারা দেশ যখন তোলপাড় তখন আমরা এই স্পাইওয়ারের সম্বন্ধে বিশদ আলোচনার জন্য পেয়ে গেলাম বিশেষজ্ঞ আইনজীবী অ্যাডভোকেট বিভাস চ্যাটার্জীকে, যিনি সাইবার এবং প্রাইভেসী আইন নিয়ে কাজ করেন। সবটাই শুরু হয়েছে আপনারা জানেন দ্য ওয়্যার ম্যাগাজিনের রিপোর্টের ভিত্তিতে। আজকে আমাদের এই কথোপকথন সেই রিপোর্টের সত্যতার ভিত্তিতেই।

তিয়াষা বসু– পেগাসাস কি?

বিভাষ চ্যাটার্জী– পেগাসাস একটি স্পাইওয়্যার যা ইস্রায়েলি সাইবার আর্মস সংস্থা এনএসও গ্রুপ দ্বারা বিকাশ করা হয়েছে, যা গোপনে মোবাইল ফোনে ইনস্টল করা যেতে পারে। টেকনো লিগাল পার্সপেক্টিভ থেকে এনালাইসিস করলে দেখা যাচ্ছে পৃথিবী জুড়ে বহু সাংবাদিকের ফোনে স্পাইওয়ার পাওয়া গেছে যেখানে ভারতের ই প্রায় ৪০ জন সাংবাদিক রয়েছেন। এই স্পাইওয়ার দিয়ে মোবাইলের বিভিন্ন এপ্লিকেশন কে নিজের কন্ট্রোলে নেওয়া হচ্ছে।

তিয়াষা বসু– কি করে বোঝা গেলো পেগাসাসের সাহায্যে মোবাইল ফোন হ্যাক করা হচ্ছে?

বিভাষ চ্যাটার্জী– বেশ কিছু সাংবাদিকের মোবাইলে ফরেনসিক এনালাইসিস করে পেগাসাস স্পাইওয়ারের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। দ্য ওয়্যার ম্যাগাজিনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইন্ডিপেন্ডেন্ট সাইবার ফরেনসিক এনালাইসিস করে মোবাইলে পেগাসাসের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে।

তিয়াষা বসু– এই ধরণের স্পাইওয়্যারের ব্যবহারে কি ধরণের আইনি জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে?

বিভাষ চ্যাটার্জী– যেকোনো ডেমোক্রেটিক দেশে ইন্টারসেপশন দুভাবে ভাগ করা হয়ে -ল্যফুল ইন্টারসেপশন এবং আন-ল্যফুল ইন্টারসেপশন। ল্যফুল ইন্টারসেপশন যেগুলো কোর্টের অর্ডার এবং আইন মেনে করা হয়ে। দ্য ইন্ডিয়ান টেলিগ্রাফ অ্যাক্ট ১৮৮৫, সেকশন ৫ সাবসেকশন ২, তে বলা আছে যে কেন্দ্রীয় সরকার বা রাজ্য সরকার জরুরি অবস্থা বা জননিরাপত্তার স্বার্থে ফোন ইন্টারসেপ্ট করতে পারে । তথ্য প্রযুক্তি আইন ২০০০, সেকশন ৬৯এ ও বি অনুযায়ী, দেশের সুরক্ষা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে, এবং বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষার স্বার্থে সাইবার সুরক্ষার জন্য যেকোন কম্পিউটার সংস্থার মাধ্যমে ট্র্যাফিক ডেটা বা তথ্য নিরীক্ষণ ও সংগ্রহের অনুমোদনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রকে। আধুনিকতম তথ্য প্রযুক্তি আইন ২০২১ যেটা সারা দেশে তোলপাড় চলছে, সেই আইন অনুযায়ী সামাজিক যোগাযোগ এবং তথ্য প্রযুক্তির ওপর আরো বেশি নজরদারির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রকে, যা অনেক ক্ষেত্রেই বাকস্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পরিপন্থী বলে মনে করছেন অনেকেই। পি ইউ সি এল ১৯৯৭ এর মামলায় প্রশ্ন উঠেছিল যে ভারতবর্ষে অনেক মামলার ক্ষেত্রে আন-ল্যফুল ইন্টারসেপশন করা হয়ে এবং সেই মামলার জাজমেন্টেই এটা বলা হয়েছিল যে কোন কোন ক্ষেত্রে ইন্টারসেপশন ল্যফুল অথবা আন-ল্যফুল। ২০১৭ তে সুপ্রিম কোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ রায় দিলেন যে ব্যক্তিস্বাধীনতা মানুষের মৌলিক অধিকার এবং এটিকে আর্টিকেল ২১ এর অন্তর্গত করা হলো। এরপর ২০১৯এর ডিসেম্বরে ইলেকট্রনিক্স এবং তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী শ্রী রাবি শঙ্কর প্রাসাদ দ্বারা লোক সভায় একটি পার্সোনাল ডাটা প্রটেকশন বিল পেশ করা হয়েছিল, যেটি এখনো বিল হিসেবেই আছে অ্যাক্ট এ পরিবর্তিত হয়ে নি। এর ওপর ভিত্তি করে ইন্ডিয়ান টেলিগ্রাফ রুল ৪১৯এ এলো যাতে বলা হলো কারুর ফোন কতদিনের জন্য ইন্টারসেপ্ট করা যাবে ইত্যাদি। ফরেনসিক এক্সপার্টদের রিপোর্ট অনুযায়ী পেগাসাস শুধু মাত্র ফোন তাপ্পিযং করছে এমন নয়। এটি এমন একটি স্পাইওয়ার যেটা এই ফোন এবং এন্ড্রোইড দুটোরই সিকিউরিটি কোড ভেঙে ঢুকতে পারে। রিপোর্ট অনুযায়ী এটাও জানা গেছে যে এই স্পাইওয়ারটা মোবাইলের সব তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। কর্পোরেট এস্পিওনাগ ক্রাইমে অনেক ক্ষেত্রেই এই স্পাইওয়ার গুলির ব্যবহার প্রমাণিত। এগুলি রোধ করার জন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সরকারের এই বিল যা কে অ্যাক্ট এ পরিণত করা দরকার। তাহলে এই সংস্থা গুলির আর্থিক জরিমানা এবং ২-৩ বছরের অজামিনযোগ্য (non-bailable) সাজা হতে পারে। বর্তমানে যখন প্যানডেমিকের জন্য মানুষ ক্রমশ ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে তখন এই ধরণের ক্রাইম এর সম্ভাবনাও বেড়ে যাচ্ছে। দ্য ওয়্যার ম্যাগাজিনের রিপোর্ট যদি সত্যি হয়ে তাহলে এটি আমাদের ব্যক্তিস্বাধীনতার বিরুদ্ধে এক মারাত্মক পদক্ষেপ হতে চলেছে।

তিয়াষা বসু– আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য এরকম স্পাইওয়ারের হাতে যাওয়ার থেকে প্রতিরোধ কিভাবে করা সম্ভব?

বিভাষ চ্যাটার্জী:
১. কোনো অজানা সোর্স থেকে আশা কোনো লিংক বা ফাইল ডাউনলোড করা থেকে দূরে থাকা উচিত।
২. যখন ইন্টারনেট বা মোবাইলের ব্যবহার হচ্ছে না তখন নেট অফ করে রাখা ও সমস্ত এপ্লিকেশন থেকে লগ আউট হয়ে থাকা।
৩. কোনো প্রাইভেট কাজের সময় ইন্টারনেট প্রয়োজন না থাকলে নেট অফ করে রাখা বাঞ্চনীয়।
৪. ইন্টারনেটে প্রাইভেট জিনিস কম শেয়ার করা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *